আমরা যারা চন্দ্রপূষ্ঠে মানব অবতরণের যুগে জন্মেছি তাদের প্রায় সবারই মহাকাশ বিষয়ে অগাধ কৌতূহল। এই বিষয়ে টিভিতে কোনাে অনুষ্ঠান হলে কিংবা কোনাে বইয়ে পত্রিকায় কোনাে তথ্য পেলে অথবা কোনাে আলােচনা হলে আমরা অনুসন্ধিৎসু হয়ে পড়ি। টিভিতে এমনই এক অনুষ্ঠানে দেখানাে হচ্ছিলাে মহাকাশযাত্রার পেছনে অভিযাত্রীরা ব্যতীত আরও কত মানুষের কী কী অবদান থাকে। একপর্যায়ে দেখানাে হলাে কীভাবে নভােচারীদের পােশাক তৈরি হয়। বয়কা এবং অভিজ্ঞ একদল মহিলা একত্রে বসে একেকটি পােশাক হাতে সেলাই করে তৈরি করেন। তারপর এর একেকটি ফোঁড় পরীক্ষা করে দেখেন, ফোঁড়টি মজবুত হলাে কিনা।


সাক্ষাতকারে তাঁদের একজন জানালেন, ‘আপনারা তো জানেন মহাকাশে কোনাে স্থানে অসম্ভব শীতল আবার কোনাে স্থানে কল্পনাতীত গরম। আর কোথাও এই তারতম্য ঘটে অকল্পনীয় দ্রুততার সাথে। মানবদেহ এতাে দ্রুত তাপমাত্রার পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে সক্ষম নয়। তাই নিরাপদ অবস্থান থেকে বেরােতে গেলেই নভােচারীদের এই বিশেষ পােশাকের ওপর নির্ভর করতে হয়। এখানে একটি ফোঁড়ও এদিক সেদিক হলে তাপ বা শৈত্যের কারণে বিরাট বিপদ ঘটে যেতে পারে। আমাদের একেকটি ফোঁড়ের শুদ্ধতার ওপরেই নির্ভর করে আমাদের ছেলেদের জীবন মরণ।


তাই আমরা প্রতিটি ফোঁড় দেই সাবধানতার সাথে এবং কাজ শেষ হলে আবার প্রতিটি সেলাই আলাদাভাবে পরীক্ষা করে দেখি, এতে কোথাও কোনাে ফাঁক রয়ে গেল কিনা।


এই অনুষ্ঠানটি দেখার পর পােশাক সম্পর্কে আমার ধারণা পালটে গেল। এতদিন আমার ধারণা ছিল পােশাক আমাদের গ্রীষ্মের দাবদাহ, শীতের তীব্রতা, বর্ষার বৃষ্টি, মানুষের দৃষ্টি এবং রােগজীবাণু হতে রক্ষা করে। সুন্দর পরিচ্ছদ আমাদের শরীরের ক্রটি-বিচ্যুতি ঢেকে আমাদের সাধারণত্ব দৃষ্টিনন্দন করে তােলে। আর সবচেয়ে বড় কথা আরামদায়ক পােশাক আমাদের শরীর মনে এনে দেয় প্রশান্তি ও পরিপূর্ণতা। কিন্তু পােশাকের ওপর মানুষের জীবন মৃত্যু পুরােপুরি নির্ভর করতে পারে এমনটা ফায়ারম্যানদের পােশাক, ইঞ্জিনিয়ারদের হেলমেট অথবা শেফদের অ্যাপ্রন দেখেও কখনাে মাথায় আসেনি। এই তথ্যটি পরবর্তীতে আমাকে বৈবাহিক সম্পর্কের বৈশিষ্ট্য বুঝতে সাহায্য করেছে। কারণ এই বিশেষ সম্পর্কটির স্বরূপ সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, তারা তােমাদের পরিচ্ছদ এবং তােমরা তাদের পরিচ্ছদ। (আল বাকারা: ১৮৭)


এটা খুবই আশ্চর্যজনক একটি ব্যাপার যে, বৈবাহিক বন্ধন রক্তের বন্ধনের মতাে সহজাত বা অটুট নয়। বন্ধুত্বের সম্পর্কের মতাে সহজ নয়, সহকর্মীদের সাথে সম্পর্কের মতাে আনুষ্ঠানিক নয়; অথচ এই সম্পর্কে রয়েছে দুর্গের মতাে মজবুত একটি পরিবার গঠনের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পারস্পরিক পরামর্শক্রমে পালনার্থে প্রয়ােজন দুজনের মাঝে বন্ধুত্ব। আবার জীবনের পথ চলায় পারস্পরিক সম্মান এবং সহযােগিতার মাধ্যমে একটি সহজ পথ খুঁজে নেবার জন্য প্রয়ােজন সহকর্মীর মতাে বুঝাপড়া। মানব দেহের সাথে পােশাকের যে সম্পর্ক, এই দুই ব্যক্তির মাঝে এমন সম্পর্ক গড়ে তােলার পরামর্শ দিয়ে, আল্লাহ তায়ালা এই সম্পর্কের মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টিকে আরও প্রসারিত ও বিস্তৃত করতে চেয়েছেন। তাঁর এই কথার তাৎপর্য যতই চিন্তা করা যায়, ততই এই তুলনার যথার্থতা নতুন নতুন ভাবনার দিগন্ত উন্মােচিত করে।


জন্মের সময় একটি শিশু পােশাক ব্যতিরেকেই দুনিয়ায় এসে বটে কিন্তু যতই তার বয়স বাড়তে থাকে, পােশাক তার জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। একইভাবে আমাদের অংশে অনুপস্থিত ব্যক্তিটিকে ছাড়া এতগুলাে বছর কাটানাে গেলেও, বিয়ের আগে বিয়ে করবাে না বলে কান্নাকাটি করে বুক ভাসিয়ে দিলেও, পর পর দুজনের দা কুমড়াে সম্পর্ক হলেও, একপর্যায়ে দুজনের সম্পর্ক হয়ে যায় রক্তের সম্পর্কের চেয়েও আপন। যদিও সে অবস্থাতেও এই কেবল তিনটি শব্দ উচ্চারণ করেই ভেঙ্গে দেয়া পােশাক খুলে ফেলার মতােই সহজ ব্যাপার! কিন্তু তারপরও যে এই নাজুক সম্পর্কটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে টিকে যায়, সেটা অলৌকিক বৈ কি! এই সম্পর্কটির ভিত্তিপ্রস্তরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে পরিবার নামক কাঠামােটি। এই পরিবারের প্রধান দুই ব্যক্তির সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে এর সদস্যদের ভালাে বা মন্দ থাকা, গড়ে ওঠা ধ্বংস হয়ে যাওয়া।


আমরা যেমন শীতকালে গায়ে চাদর জড়িয়ে ছােট শিশুদের চাদরে পেঁচিয়ে নিয়ে ওম দেয়ার চেষ্টা করি, ঠিক একইভাবে এই সংসারের চাদরের ওমে বেড়ে ওঠে এর সন্তান এবং আশ্রিতজনেরা। এর জন্য আমরা এমন ব্যক্তিকেই সঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে সচেষ্ট হই, যে এই সম্পর্কটিতে নিয়ে আসবে পরিপক্কতা এবং মানিয়ে চলার ক্ষমতা। কারণ রেশমের মনােহর রঙ আর মােলায়েম জমিন আমাদের দৃষ্টিকে সম্মোহিত করে। কিন্তু আরামের জন্য আমরা সবসময় সুতিই বেছে নিই। বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ দুই ব্যক্তি পরস্পরকে দৈনন্দিন জীবনের নানান ঘাতপ্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে উত্তরণের সাহস শক্তি জোগায়। একে অপরকে মানসিক যন্ত্রণা শারীরিক বেদনা হতে আড়াল করে রাখে। রাসূল বলেন, উত্তম যাকে দেখলে ব্যক্তি তার সমস্ত সমস্যার কথা ভুলে যায়, শান্তি পায়। তাইতাে আমরা দোয়া করি, আমাদের পরিবারবর্গ যেন আমাদের জন্য চক্ষুশীতলকারী হয়। বাইরের পৃথিবীর কর্কশ বাস্তবতা থেকে আত্মরক্ষার জন্য একটি প্রশান্ত মরুদ্যান রচনা করাই স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মূল উদ্দেশ্য। ঠিক যেভাবে বৈরী আবহাওয়া থেকে আত্মরক্ষা এবং শরীরের আরাম নিশ্চিত করাই পােশাক পরিধানের মূল উদ্দেশ্য।


কোনাে পােশাক যখন আমরা প্রথম পরতে শুরু করি তখন পােশাকটি সচরাচর আরামদায়ক থাকে না। পরতে পরতে একসময় আরামপ্রদ হয়ে যায়। বন্ধুত্বের মতাে। বৈবাহিক ক্ষেত্রেও বন্ধুত্ব হতে একটু সময় লাগে। সম্পূর্ণ আলাদা দু’টি পরিবেশ থেকে দুজন মানুষের তেলে জলে মিশ খেতে সময় লাগা স্বাভাবিক বৈ কি! কিন্তু দুজনে শলাপরামর্শ করে কাজ করলে সম্পর্কটি উভয়ের জন্যই সহজতর এবং কল্যাণময় হয়। উত্তম পােশাক সেটিই যা ব্যক্তির শারীরিক ত্রুটি সমূহ আড়াল করে তাকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে, মন প্রফুল্ল রাখে। ব্যক্তিমাত্রেই নানাবিধ ত্রুটি বিচ্যুতি থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু একটি সুন্দর সম্পর্কের ভিত্তি হলাে, উভয় সঙ্গী পরস্পরের আত্মসম্মানের ব্যাপারে সচেতন হবেন এবং মানুষের কাছে পরস্পরের নামে দোষারােপ করার পরিবর্তে নিজেদের মাঝে সমঝােতা করার প্রতি আগ্রহী হবেন। উভয় সহযােগী একত্রে বসে ঠিক করে নেবেন কোন ক্রুটিগুলো ক্ষমার যোগ্য, কোনগুলাে থেকে উত্তরণ জরুরি এবং এর জন্য কী কর্মসূচী গ্রহণ করা যায়। এভাবে পারস্পরিক আলােচনা, পর্যালোচনা এবং সহযােগিতার মাধ্যমে উভয়ই পর্যায়ক্রমে নিজ নিজ ত্রুটি-বিচ্যুতি হতে উত্তীর্ণ হতে পারেন। ফলে উভয়ই অপেক্ষাকৃত উন্নত মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার সুযােগ পান। আমাদের প্রিয় পােশাকটি যখন জৌলুস হারিয়ে ফেলে তখনও আমরা তাকে সযত্নে আলমারীতে তুলে রাখে। ফেলে দেবার কথা কল্পনা করতে পারি না। পছন্দের পােশাকটির কোনাে ক্ষতি হলে তাকে রিপু করে ব্যবহার করি, তবুও কাউকে দিয়ে দেয়ার কথা ভাবি না। আমাদের যার সাথে বিয়ে হয়, স্বভাবতই তার সাথে অনেক ব্যবধান থাকে। সার্বক্ষণিক দেখা-সাক্ষাতের ফলে সাথিটির দোষক্রুটি বেশি দৃষ্টিগােচর হয়। এর অর্থ এই নয় যে, অন্যত্র বিয়ে করলে কোনাে সমস্যাই থাকত না। সেখানে হয়তাে এই একই সমস্যাগুচ্ছ থাকত না। কিন্তু অন্যান্য সমস্যাবলি অবশ্যই আবিষ্কার হতাে, যেহেতু কোনাে ব্যক্তিই ত্রুটিমুক্ত নয়। একটি সুন্দর পােশাকের যত্নের পেছনে আমরা যেভাবে সময় এবং শ্রম ব্যয় করি, তেমনি শুধু বৈবাহিক সম্পর্ক নয়, যেকোনাে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য কিছু মানিয়ে নেয়া, কিছু সময় এবং শ্রম ব্যয় করার মানসিক প্রস্তুতি বাঞ্ছনীয়। সেই সাথে দরকার পরিচর্যা। প্রিয় পােশাকটি যেমন আমরা সহজেই ফেলার কথা ভাবি না, তেমনি এই সম্পর্কটিকেও ভাবা উচিত নয়। যেকোনাে সম্পর্ক নষ্ট হবার সেক্ষেত্রে ইগােকে দমিয়ে সম্পর্ককে প্রাধান্য দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।


কাপড় বেশি টানাহেঁচড়া করলে ছিড়ে যায়। একইভাবে পরস্পরের ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে তাচ্ছিল্য হেয় করলে তাদের সম্পর্কটা নষ্টের দ্বারপ্রান্তে চলে তর্কবিতর্কের সময় বাড়াবাড়ি করলে তিক্ততার সৃষ্টি হয়, পরবর্তীতে একটি সম্ভাবনাময় সম্পর্কের ইতি ঘটতে পারে। কর্মক্ষেত্রে মতবিরােধ অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি ব্যাপার এবং অনেক সময় এই বিরোধ বহুদিন ব্যাপী চলতে পারে। কিন্তু এর কারনে আমরা চাকরিও ছাড়ি না কিংবা ঐ সহকর্মীর প্রতি শ্রদ্ধাও হারিয়ে ফেলি না। স্বামী-স্ত্রী ছাড়ি সহকর্মীর প্রতি শ্রদ্ধাও হারিয়ে ফেলি না। কর্মজীবী মাত্রেই জানেন এটা যেকোনাে বৃহৎ লক্ষ্য অর্জনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া মাত্র। একইভাবে আমরা কাপড়ে ময়লা লাগলে মন খারাপ করি, তারপর উঠে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিই। যখন দুজনের ঝগড়া হয় তখন মনো মালিন্য হয় বটে; কিন্তু সেই মুহুর্তেও তারা একে অপরকে ভালোই তো বাসে! তাহলে সামান্য কথায় জেতা বা পরস্পরকে মোক্ষম আঘাতের সুযোগ প্রহণ করার জন্য কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির পরিবর্তে ধৈর্য্যধারণ এবং পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখাটা অধিকতর কল্যাণকর। তলোয়ারের আঘাতের চিহ্ন এক সময় মুছে যায়, কিন্তু জিহ্বার আঘাতের ক্ষত বড় সাংঘাতিক। এটি কখনো পূরণ হয় না। ঠিক যেমন কাপড় ছিড়ে গেলে রিপু করা যায়, দাগ লেগে গেলে ধুয়ে নেওয়া যায়, কিন্তু কাপড় পুড়ে গেলে আর কিছু করার মতো অবিশিষ্ট থাকে না। ভালোবাসা ছাড়াও একটি সংসার চমৎকারভাবে উৎরে যেতে পারে। কিন্তু পারস্পরিক সম্মানবোধ ছাড়া কোনো সম্পর্কই টিকতে পারে না। সুতরাং স্বামী-স্ত্রী আর যা কিছু নিয়েই বাড়াবাড়ি করুক না কেন, পরস্পরের আত্মসম্মানবোধের প্রতি আঘাত করা থেকে বিরত থাকা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।


পরিশেষে প্রথম উদাহরণটিতে ফিরে যাই। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তােমরা নিজেদের এবং তােমাদের পরিবারসমূহকে সেই আগুন থেকে রক্ষা কর যার জ্বালানী হবে মানুষ এবং পাথর। (আত তাহরীম: ৬)


এক্ষেত্রে বৈবাহিক সম্পর্কে জড়িত দুজন ব্যক্তি পার্থিব স্বার্থের উর্ধে উঠে পরস্পরকে এমন একটি কুসুমাস্তীর্ণ পথের সন্ধান দিতে চায়, এমন এক পথে পরস্পরের হাত ধরে এগােতে চায়, যা এই আগুন হতে অনেক অনেক দূরে, নিরাপদ কোনাে বন্দরে গিয়ে মিলাবে শান্তির আবাসস্থল। এভাবে সংসারের প্রতিটি সমস্যায় বিশ্বাস এবং ভালোবাসার ফোঁড় দিয়ে দুজনে একে অপরের জীবন রক্ষার জন্য, একে অপরের কল্যাণ চিন্তায় লড়ে যায়। এভাবে দুটি মানুষ, যারা জীবনের এতগুলাে বছর একে অপরকে দেখেনি, চেনেনি, জানেনি, ভাবেনি তারাই হয়ে যায় একে অপরের সবচেয়ে বড় শুভাকাক্ষী!


আল্লাহ তায়ালা স্বামী স্ত্রীর বন্ধনকে তুলে ধরেছেন মাত্র সাতটি শব্দে, যা বিশ্লেষণ করতে গেলে মনে হয় যদি সাত সমুদ্র কালি হতাে! নিজের যােগ্যতার অভাবে গালে হাত দিয়ে বসে ভাবি, আমিও সেসব শিল্পীদের মতাে যারা নিজের মনের ভাব সম্যকভাবে প্রকাশ করতে অক্ষম, যারা এত প্রেমের গল্প, উপন্যাস, নাটক, সিনেমা, চিত্রকর্ম ও অভিনয় দিয়েও এই সাতটি শব্দে যে রােমান্টিসিজম বর্ণনা করা হয়েছে তাকে ছুঁতে পারে না!


– রেহনুমা বিনতে আনিস





মূল সংবাদটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন