ঢাকা, ১৪ অক্টোবর- স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেওয়া প্রতিদিনের তথ্য অনুসারে, সারা দেশে এখন পর্যন্ত করোনা শনাক্ত হয়েছেন তিন লাখ ৭৯ হাজার ৭৩৮ মানুষ। এদিকে শুধু রাজধানী ঢাকার ৪৫ শতাংশ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে। করোনার প্রকোপের মধ্যে রাজধানীতে একটি খানা জরিপ চলেছে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত। সে সময়ে আইইডিসিআর-এর তথ্যমতে, রাজধানী ঢাকাতে করোনা শনাক্ত হয় ৬৫ হাজার ৭৯০ জনের। আর খানা জরিপের হিসাবে ধরলে, ঢাকাতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় এক কোটির মতো।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়মিত তথ্যের বাইরেও অসংখ্য মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। লক্ষণ-উপসর্গ না থাকার কারণে তারা পরীক্ষার বাইরে থেকেছেন। এসব কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, দেশের কতো মানুষ তাহলে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন?


তবে কেবল বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর সব দেশেই শনাক্ত হওয়া ব্যক্তির চেয়ে আক্রান্ত হওয়া মানুষের সংখ্যা বেশি মন্তব্য করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘মহামারির সময়ে সবাইকে আরটিপিসিআর টেস্টের আওতায় আনাও সম্ভব নয়।’


দেশে প্রথম করোনার সেরোসার্ভিলেন্স নিয়ে করা এক যৌথ গবেষণায় ঢাকাতে ৪৫ শতাংশ মানুষের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) যৌথভাবে এই গবেষণা করে। তবে শুরু থেকেই সরকারি তথ্য নিয়ে সাধারণ মানুষ এবং জনস্বাস্থ্যবিদরা সংশয় প্রকাশ করেছেন।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খানা জরিপ আর স্বাস্থ্য অধিদফতরের মোট হিসাবকে কোনোভাবেই তুলনা করা যাবে না, কোনও দেশেই কেউ করবে না। বাংলাদেশের এই যৌথ গবেষণার মতো একইরকম স্টাডি ভারতের মুম্বাই, পুনে এবং দিল্লিতে হয়েছে। সেখানেও শনাক্ত হওয়া রোগীর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মানুষ আক্রান্ত।


মূল বিষয়, দেশে সংক্রমণ ব্যাপক হলেও সেটা মানুষ বুঝতে পারেনি। জনস্বাস্থ্যবিদদের ধারণা ছিল, প্রচুর মানুষ আক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু সেটা যে এতো বেশি তা ধারণার বাইরে ছিল।


স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসেবে বাইরে থাকার প্রধান কারণ, শতকরা ৮২ শতাংশ মানুষই লক্ষণ উপসর্গবিহীন, আর লক্ষণ না থাকায় তারা পরীক্ষা করাতে যাননি। উদাহরণ দিয়ে জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, ১০০ জনের পরীক্ষাতে উপসর্গহীন ৮২ জন মানুষকে প্রথমেই বাদ দিলে থাকে ১৮ জন। এই ১৮ জনের মধ্যে কিছু মানুষ পরীক্ষা করাতে গিয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের যে তথ্য আমরা পাই, সেটা হচ্ছে শুধু পরীক্ষা করাতে আসা মানুষের। এছাড়া মানুষ পরীক্ষা করেছে কম, অনেকে চিকিৎসা নেয়নি, বাড়ির কাছের ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ কিনে খেয়েছে। যার কারণে মানুষ বুঝতে পারেনি। তাই স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য আর এই গবেষণার তথ্য মিলবে না বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।


আরও পড়ুন: মতিঝিল নয়, সরাসরি কমলাপুর যাচ্ছে মেট্রোরেল


প্রসঙ্গত, অ্যান্টিবডি পরীক্ষায় ঢাকার ৪৫ শতাংশ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে। একইসঙ্গে ঢাকার বস্তিগুলোতে আক্রান্ত হয়েছেন ৭৪ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ ঢাকার ৪৫ শতাংশ মানুষের শরীরে ইতোমধ্যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। অপরদিকে, ঢাকার বস্তিগুলোর ৭৪ শতাংশ মানুষের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। আর তাদের শরীরেই অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, যারা ইতোমধ্যেই কোভিড আক্রান্ত হয়েছেন।


স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও এই জরিপ শুরু হওয়ার সময়ে আইইডিসিআর-এর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘এই তথ্য যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। এতদিন যেসব তথ্য দেওয়া হচ্ছিল, তা ছিল যারা পরীক্ষা করাতে আসেন তাদের ওপর ভিত্তি করে। বাড়িতে যারা ছিলেন, তাদের কোনও তথ্য নেওয়া হয়নি।’


তিনি বলেন, ‘গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের ওই সময় পর্যন্ত ঢাকায় ৪৫ শতাংশ মানুষ করোনাভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার পর তাদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল।’


তিনি আরও বলেন, ‘যখন কারও লক্ষণ উপসর্গ থাকে, তাকেই শুধু শনাক্ত করে আমরা আইসোলেশনে নিচ্ছি। কিন্তু যার লক্ষণ ও উপসর্গ নেই, তাকে আক্রান্ত বলে ধরছি না।’


জানতে চাইলে আইইডিসিআর-এর উপদেষ্টা ও মহামারি বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘যারা শুধু পরীক্ষা করাতে আসছেন, তার বাইরে শুধু কন্টাক্ট ট্রেসিংয়ের সময়ে লক্ষণ উপসর্গহীন মানুষকে পরীক্ষা করা হচ্ছে, এর বাইরে লক্ষণ না থাকলে পরীক্ষা হচ্ছে না। তবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়মিত তথ্যে এসব উপসর্গহীন মানুষের তথ্য যে একদম পাওয়া যায় না, তা নয়, তবে অধিকাংশই পাওয়া যায় না।’


তিনি আরও বলেন, ‘এর আগে ২০০৯ সালে সোয়াইন ফ্লুর সময়েও সেরো প্রিভ্যালেন্স করে দেখা গেছে, কমপক্ষে ১০ গুণ মৃদু লক্ষণযুক্ত রোগী সার্ভিল্যান্সের বাইরে থাকে আর সর্বোচ্চ থাকে ৪০ গুণ। ১০ থেকে ৪০ গুণ রোগী ল্যাবরেটরি শনাক্তের বাইরে থাকে। বাংলাদেশেও করোনায় যা শনাক্ত হচ্ছে, তার কমপক্ষে ১০ গুণ, সর্বোচ্চ ৪০ গুণ রোগী বাইরে থাকছেন। কিন্তু ঢাকাতে আমার অনুমানে ৮০ গুণ রোগী বাইরে থাকছেন, তবে ঢাকার বাইরে সংক্রমণের হার রাজধানীর মতো হবে না, কম হবে।’


আবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, সব দেশেই শতকরা ১০ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। সেই হিসেবে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যা হিসেবে আক্রান্ত হয়েছে এক কোটি ৬০ লাখ। আর ঢাকাতেই যদি ৯০ লাখ হয়, বাকিটা তাহলে ঢাকার বাইরে। আমাদের গবেষণাও তার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে মন্তব্য করে ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘এর সঙ্গে আগে করা সোয়াইন ফ্লুর গবেষণার সঙ্গেও মিলে যাচ্ছে।’


তবে মহামারির সময়ে পুরো বিশ্বের চিত্রই একইরকম মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘ভারতের দিল্লি এবং উত্তর প্রদেশে গত মে মাসে সর্বোচ্চ সংক্রমণ হয়। তখন সেরো প্রিভ্যালেন্স স্টাডিতে আসে শতকরা ৮০ গুণ মানুষ তাদের টেস্টিং এর বাইরে থেকে গেছে।’


গবেষণার সময়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেওয়া তথ্যের মোট শনাক্তের বাইরেও অনেক রোগী থেকেছেন এবং এটাই নিয়ম মন্তব্য করে কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. শহীদুল্লাহ বলেন, ‘সারা পৃথিবীতে যতো রোগী শনাক্ত হয়, তার চেয়ে সর্বনিম্ন ১০ গুণ বেশি মানুষ থাকেন আনআইডেন্টিফায়েড। ভারত, আমেরিকাতেও একই রিপোর্ট, কারণ সবাই যান না পরীক্ষা করতে।’


বিশ্বে এজন্যই সেরোসার্ভিল্যান্স করা হয় জানিয়ে ড. শহীদুল্লাহ বলেন, ‘একটি হচ্ছে কনফার্ম কেস, এই মুহূর্তে কারা তাদের জন্য আরটিপিসিআর অথবা র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট এবং সেরোসার্ভিল্যান্স হচ্ছে র‌্যাপিড অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করে লক্ষণযুক্ত এবং লক্ষণ ছাড়া অথবা মৃদু লক্ষণ সব মিলিয়ে কতো মানুষ ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়েছেন সেটা পরীক্ষা করা।’


সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন
এন এইচ, ১৪ অক্টোবর





মূল সংবাদটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন